No icon

আপনারা কি আমাকে একটা ঘর দিতে পারেন না?: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে চার দিন চিকিৎসাসেবা নেওয়া শেষে ১৩ মে বাসায় ফেরেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। এই মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেই পোস্টে গুণী এই মানুষের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি এখন ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারায় গৃহবন্দী থাকি, একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। এ এক অভূতপূর্ব করুণ অধ্যায়। একটি ঘরে ৬ বছর গৃহবন্দী থাকতে থাকতে আমি উল্লেখযোগ্যভাবে অসুস্থ। আমার হার্টে ৮টা ব্লক ধরা পড়েছে, বাইপাস ছাড়া চিকিৎসা সম্ভব না।’ এই পোস্ট দুই সহস্রাধিকেরও বেশিবার শেয়ার হয়। শিল্পী-সহকর্মী থেকে শুরু করে ভক্তরাও প্রিয় মানুষটির সুস্থতা কামনা করে মন্তব্য করেন। আবেগঘন এই পোস্ট নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এরপর প্রধানমন্ত্রী স্বপ্রণোদিত হয়ে গুণী মানুষটির চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্বভার নেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফা চিকিৎসক দল তাঁর আফতাবনগরের বাসায় যায়। সিদ্ধান্ত হয়, কোথায় চিকিৎসাসেবা নেবেন। সবকিছু নিয়ে আজ রোববার সকালে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল


আপনার চিকিৎসার জন্য কারও কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন?

আমার অসুস্থতার খবরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটা প্রতিনিধিদল সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছে। ভেবে দেখলাম যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথার বরখেলাপ করতে পারব না। তাঁর কথায় রাজি হয়েছি। আজ রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক চিকিৎসক জুলফিকার লেনিনকে আমার চিকিৎসার যাবতীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে দিয়েছি। এরপর তাঁরা ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে হাসপাতালে আমার চিকিৎসক সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও অধ্যাপক লিয়াকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তাঁদের কাছ থেকে আমার সর্বশেষ অবস্থা জানবেন। এরপর তাঁরা বিশেষজ্ঞ হৃদ্‌রোগ সার্জন ঠিক করবেন। যেখানে তাঁরা ভালো মনে করবেন, সেখানেই চিকিৎসা হবে।

শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলছেন, আপনার চিকিৎসা যেন দেশের বাইরে হয়। 
সরকারের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, আমি কোথায় চিকিৎসা করতে চাই। দেশে, নাকি বিদেশে? আমি বলেছি, আমার চিকিৎসা দেশেই হবে। হৃদ্‌রোগের অনেক ভালো চিকিৎসক আমাদের দেশে আছেন।

কবে অস্ত্রোপচার হবে? 
আজ অথবা আগামীকালের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে। এরপর হাসপাতালে ভর্তি হব। হাসপাতাল ছাড়ার আগে চিকিৎসক বলেছিলেন, ১০ দিনের মধ্যে হার্টের বাইপাস অস্ত্রোপচার করাতে হবে। এর মধ্যে কয়েক দিন পার হয়ে গেছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না।

গত বুধবার রাতে আপনার বাসায় যখন কথা হচ্ছিল, বলেছিলেন, কিছু গানের কাজ বাকি আছে।
আমার ভাবনায় গান, আমার ভাবনায় সাধনা। আমার ভাবনায় স্বাভাবিক জীবন। বাইপাস অস্ত্রোপচারের পর যখন বাসায় ফিরব, তখন কিছুটা অসুস্থ থাকব। আমি তো আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারব না। তা ছাড়া গানের জগতের অবস্থা এখন আর আগের মতো নেই।

তাহলে?
সরকারের পক্ষ থেকে যাঁরা যোগাযোগ করেছেন, তাঁদের বলেছি, বাইপাসের পর আমাকে অনেক বেশি সহযোগিতা করতে হবে। আমি কোথায় থাকব, কীভাবে থাকব, আমার আয় কী হবে? আমি কীভাবে চলব, সবকিছু নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। একটা অস্ত্রোপচার করে দিল, এরপর সবাই চুপ হয়ে গেলে হবে না। তাহলে তো একই জীবন হয়ে গেল। অনেকটা এমন, জেলখানা থেকে বের করে আসামিকে চিকিৎসা দিয়ে আবার জেলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

এখনো গান নিয়ে তাঁর যত ভাবনা। ছবি: প্রথম আলোএখনো গান নিয়ে তাঁর যত ভাবনা। ছবি: প্রথম আলো

আপনার এমন কেন মনে হচ্ছে? 
আমার জীবনটা জেলখানার মতো। সরকারের নির্দেশেই ২০১২ সালে আমাকে যুদ্ধাপরাধীর ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সাক্ষী হিসাবে দাঁড়াতে হয়েছিল। সাহসিকতার সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে হয়েছিল ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলখানার গণহত্যার সম্পূর্ণ ইতিহাস। আর ওই গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে আমি একজন। হত্যা করা হয়েছিল একসঙ্গে ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে। কিন্তু এই সাক্ষ্যের কারণে আমার নিরপরাধ ছোট ভাই মিরাজকে হত্যা করা হবে, তা কখনো বিশ্বাস করতে পারিনি। সরকারের কাছে বিচার চেয়েছি, বিচার পাইনি। ছয় বছর ধরে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারায় গৃহবন্দী থাকি, একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। কোনো বাড়ির মালিক আমাকে বাসা ভাড়া দিতে চায় না। যেখানে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছিলাম, সেই মগবাজারের বাসা ছেড়ে আমি এখন আফতাবনগরের এই বাসা ভাড়া নিয়েছি।

পুলিশি নিরাপত্তা আপনার ভালোর জন্যই দেওয়া হয়েছে। সেটা এখন চাচ্ছেন না? 
কেন চাইব না! কিন্তু আমার কথা আরেকটু বড় পরিসরে যদি একটা সরকারি ঘর পেতাম। আমাকে তো ভাড়া দিয়ে থাকতে হচ্ছে। একটা ঘর পেলে সেই ঘরে অন্তত একটা স্কুল করেও তো জীবিকা নির্বাহ করতে পারতাম। দেশের স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে আমাকে বাড়িওয়ালাদের বাঁকা চোখে থাকতে হয়। আমি দেশের জন্য, সরকারের জন্য এত কিছু করেছি, ভাইকে হারালাম, শেষ পর্যন্ত আমিও মরতে যাচ্ছি—সরকারের তরফ থেকে আপনারা কি আমাকে একটা ঘর দিতে পারেন না? বাইপাস সার্জারির পর আমাকে যদি ঘরভাড়ার চিন্তা করতে হয়, তাহলে কী ঘটবে, জানি না।

এখন আপনার আয়ের উৎস কী? 
আমার যত সঞ্চয় ছিল, এই ছয় বছরে সব শেষ। গত মাসে উত্তরায় আমার তিন কাঠার যে জমি ছিল, সেটাও বিক্রি করে দিয়েছি। যেহেতু আমরা অনেক লোক একসঙ্গে থাকি, ছয়জন পুলিশ, ওদের দেখাশোনা করা, খাওয়াদাওয়া করতে বাবুর্চি লাগে। আমরা বাবা-ছেলে দুইটা রুমে থাকি। পুলিশ সদস্যরা থাকে ড্রয়িংরুমে। আমি কোনোভাবে ৩৫ হাজার টাকা ঘরভাড়া দিয়ে চলছি। সবকিছুর বিল আছে। আমাদের সবার জন্য প্রতিদিন কাঁচাবাজারই লাগে এক হাজার টাকার। মাসে সব মিলিয়ে দেড় লাখ টাকার মতো খরচ হচ্ছে। গান গেয়ে এক কোটি টাকা জমিয়েছিলাম। ছয় বছরে জমানো টাকা শেষ। সম্মানের সঙ্গে যাতে বাঁচতে পারি, তাই জমিটাও বিক্রি করে দিয়েছি, যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়।

সূত্রঃ প্রথম আলো 

Comment