No icon

মাদকাসক্ত দুই ছেলেকে জীবনে ফেরালেন যে বাবা

মো. শাহেদুল ইসলাম। ট্রাস্ট ব্যাংকের অন্যতম পরিচালক। প্রতিনিধিত্ব করেছেন সংগঠন এফবিসিসিআইসহ আরও গোটা চারেক ব্যবসায়ী সংগঠনের। তবে এই পরিচয়ের বাইরেও তাঁর আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি একজন যুদ্ধজয়ী বাবা। মাদকাসক্ত দুই ছেলেকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি। সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন মো. শাহেদুল ইসলাম। শুনিয়েছেন মাদকাসক্ত ছেলেদের নিয়ে তাঁর যুদ্ধদিনের গল্প। যুদ্ধটা বরাবর তাঁর অনুকূলে থাকেনি। তবু শেষ পর্যন্ত জিতেছেন।

একই রকম যুদ্ধে থাকা অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘সন্তানের মাদকাসক্তি নিয়ে লুকোছাপা না করে রোগ হিসেবে বিবেচনা করুন। চিকিৎসা–সহায়তা আর ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব।’

শাহেদুলের জবানিতেই শোনা যাক তাঁর গল্প : ‘আমার বড় ছেলেটার বয়স তখন কতই-বা, ১৩ বা ১৪ হবে। কেমন যেন রুক্ষ হয়ে উঠছিল। সন্ধ্যা হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব, আড্ডার বাড়াবাড়ি। ভাবলাম বয়ঃসন্ধিকাল। এই বয়সের ছেলেদের আচরণে কত রকম পরিবর্তনই তো হয়। তবু ঠিক দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছিলাম না। আমরা যে একেবারেই অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি, বিষয়টি তেমন নয়। বলব, বোঝার ভুল ছিল। এই ফাঁকে একটি বিষয় বলে রাখি। আমার জীবনটা কিন্তু পরিকল্পনামাফিক এগিয়েছে। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলাম। ওখান থেকে পাস করে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাই। উচ্চশিক্ষা নিই ওখানেই। আমি একজন চার্টার্ড সেক্রেটারি। দেশে চার্টার্ড সেক্রেটারিদের কাজের সুযোগ আছে জানিয়ে অনেকেই ফিরে আসতে বললেন। আমিও ফিরে এলাম। কিন্তু চাকরি-বাকরিতে আর ঢুকিনি। ব্যবসা ধরেছিলাম। দুই বছরের মধ্যে ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেল, গাড়ি কিনলাম, নিজের বাড়িতে উঠলাম। বাসার ওপরে আমার অফিস। পারিবারিক বন্ধন শক্ত। যত কাজই থাক, সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফিরতাম। আত্মীয়স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের যাওয়া-আসা ছিল। বছর শেষে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়তাম। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। তারপরও...

‘তো যা বলছিলাম। আমার দুই ছেলে একই ঘরে থাকত। ওখান থেকে আমরা মাথা ভাঙা লাইটার, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, গোল করা টাকা উদ্ধার করলাম। বুঝতে পারিনি ওসব কী কাজে ব্যবহার করা হয়। আমি বড় ছেলেকে ডাকলাম। বলল, ও সিগারেট খায়, তাই সন্ধ্যার পর বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বেরোয়। আমি ওকে সিগারেট ছেড়ে দিতে চাপ দিলাম। তা–ও ওর সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়াটা বন্ধ হলো না। শেষ পর্যন্ত হার মানলাম। বললাম, ঠিক আছে। সিগারেট যদি খেতেই হয়, তাহলে বাসায় খাও। বাইরে যেয়ো না। এখন মনে হয়, ওকে এ অনুমতি দেওয়াটা ঠিক হয়নি।

‘আমার অনুমতি পেয়ে ও বাসায় বসে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মাদক সেবন করতে শুরু করল। আচার-আচরণও দিনকে দিন অদ্ভুত হয়ে উঠছিল। কখনো মারাত্মক খেপে উঠছে, কখনো খুবই শান্ত, বিনয়ী। অভিযোগ আসতে শুরু করল বাসায়। ও ভালো কারাতে জানত। ব্ল্যাক বেল্ট হোল্ডার ছিল। আবাহনী মাঠে মারামারি করে ফিরল একবার। খেলাধুলা করতে খুব পছন্দ করত। আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। একদিন স্কুলে সবার সামনে ওর ব্যাগ চেক করা হলো। ও ঢাকার একটা নাম করা ইংলিশ স্কুলে পড়ত। ওর মা ওই স্কুলেরই শিক্ষক। আমরা খুব কষ্ট পেলাম। এভাবে সবার সামনে ছেলের অপমানটা মেনে নিতে পারলাম না। স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিলাম। এখন মনে হয়, শিক্ষকেরা হয়তো আগেই সন্দেহ করেছিলেন।

‘একটা সময় আমরাও বুঝতে পারলাম ছেলে মাদকাসক্ত। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম। ছেলে স্বীকার করল। তত দিনে কিন্তু দুই বছর কেটে গেছে। আমার ও আমার স্ত্রীর ভেতর বরাবরই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধটা ছিল। কিন্তু হলো কী, ছেলের এ অবস্থায় আমরা একে অন্যকে দোষ দিতে শুরু করলাম। এ অবস্থা আমরা বেশি দিন চলতে দিইনি। দুজনে বসে ঠিক করলাম, ছেলেটাকে সুস্থ করা প্রথম কাজ। আমরা যা সিদ্ধান্ত নেব, একসঙ্গে নেব। ওকে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নেওয়া হলো। চিকিৎসক দেখে বললেন, ছেলে অনেক দিন ধরে মাদকাসক্ত। হেরোইন আসক্ত ব্যক্তিদের অনেক ধরন আছে। কারও কারও ২৪ ঘণ্টা পরপর তাড়না জাগে। যারা বেশি আসক্ত, তাদের ক্ষেত্রে বিরতিটা কম। চিকিৎসক বললেন, আমার ছেলে ছয় ঘণ্টা পরপর হেরোইন সেবন করে।

‘চিকিৎসক রিহ্যাবে রেখে “ডিটক্স” প্রক্রিয়াটা শুরুর পরামর্শ দিলেন। চিকিৎসার প্রথম ধাপ ওটা। তিন দিন চলবে। চিকিৎসক রাজি হচ্ছিলেন না, তবুও আমি খানিকটা পীড়াপীড়ি করেই বাসায় নিয়ে এলাম। অফিস থেকে ছুটি নিলাম। ঘুমের ওষুধ দেওয়া হলো। প্রথম রাতটা ছিল ভয়ংকর। ছয় ঘণ্টা পর ও হেরোইনের জন্য অস্থির হয়ে উঠল। প্রচণ্ড গায়ে ব্যথা। ও কাকুতি-মিনতি শুরু করল, “বাবা, একটু দাও। একবারের জন্য দাও।” দ্বিতীয় রাতে কষ্ট কিছুটা কম হলো। তৃতীয় রাতটা বেশ ভালো। ভালোয় ভালোয় তিনটি দিন পেরিয়ে গেল। চতুর্থ দিনে ওর একটা বন্ধু এল। সেও যে মাদকাসক্ত আমরা জানতাম না। তবে বন্ধুটা বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা বুঝতে পারলাম, ছেলে আবার হেরোইন নিয়েছে। নেশা করলে ছেলে চুপচাপ, শান্ত। না করলেই সহিংস। কী করি!

‘ঢাকায় তখন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নেই অত। শেষ পর্যন্ত খোঁজখবর করে একটা রিহ্যাবে ওকে দিলাম। ওর ও লেভেলে পরীক্ষার সময় হয়ে গেছে তখন। দু-দুটি স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনেছি। শিক্ষকদের কাছে পড়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমনও হয়েছে যে ও শিক্ষকের বেতনের টাকা আমার কাছ থেকে নিয়ে হেরোইন কিনেছে। আমরা অবশ্য আগেই এসব ব্যাপারে শিক্ষককে বলে রেখেছিলাম। অবস্থাটা হলো তখন অনেকটা এ রকম। ও দুই সপ্তাহ রিহ্যাবে থাকে, কয়েক দিনের জন্য বাসায় আসে, আবারও রিহ্যাবে যায়। সন্ধ্যার পর আমি ওর পিছু নিতাম। দেখতাম ও কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে। আর ওর মা সারাটা রাত ছেলের জন্য জেগে থাকত। আমি আর পেরে উঠছিলাম না।

‘একসময় আমি মোহাম্মদপুরে একটি বাসা খুঁজে পেলাম। ওখানেই ছেলে নিয়মিত যেত। বাসার সামনে দামি দামি গাড়ির সারি। একদিন ওই বাসার দারোয়ান আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কে? কেন আসি। আমি সব খুলে বললাম। জানতে চাইলাম, বিক্রেতাটা কে। একদিন দারোয়ান বিক্রেতার সঙ্গে আমাকে পরিচয়ও করিয়ে দিল। আমি মাদক বিক্রেতার সঙ্গে একটা চুক্তিতে এলাম। আমার ছেলে মাদক কিনতে গেলে ও আমাকে জানাবে। মাদক আর বিক্রি করবে না। এর বিনিময়ে আমি ৫০০ টাকা দেব। হলো কী, সে আমার থেকে ৫০০ টাকা নিল ঠিকই, নিজে ৪০০ টাকা রেখে ছেলেকে ১০০ টাকার মাদক দিল। ওটাও ছিল একটা ভুল। সবচেয়ে যে জিনিসটা আমাকে পীড়া দিত, তা ছিল পরিবারের কাছে মিথ্যা বলা। আমার মা ছিলেন সঙ্গে, ভাইবোনও। কেউ যখন জিজ্ঞাসা করত ওর কথা, কখনো বলতাম কক্সবাজার গেছে, কখনো বলতাম অন্য কোথাও। কিন্তু এভাবে আর কত দিন?

‘একদিন একটা বেসরকারি টিভি চ্যানেলে গিয়ে আমি সব কথা বলে ফেললাম। হালকা বোধ হলো। বাসায় ফেরার পর আমার ভাইবোনেরা জানতে চাইল, কেন ওদের কাছে এত দিন গোপন করেছি। ওরা সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল। শুধু পরিবারের লোকজনই না, কত কত জায়গা থেকে মানুষ যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এরপর একজন পরামর্শ দিলেন মুম্বাইতে নেওয়ার। খুব ব্যয়বহুল চিকিৎসা ওখানে। একবার ভাবলাম এতগুলো টাকা জলে ফেলছি কি না। তারপরও নানা কথা ভেবে ওকে নিলাম। চিকিৎসক বললেন, কত দিনে সুস্থ হবে বলা যাচ্ছে না। এটা মেনে নিয়েই চিকিৎসা করতে হবে। আমি মেনে নিলাম। ছেলে বলল, একেবারে ছেড়ে দেওয়ার আগে সে শেষবারের মতো একবার মাদক নিতে চায়। চিকিৎসক বললেন, ঠিক আছে। নিতে পারো। কিন্তু আমি তোমাকে দিতে পারব না। নিজের ব্যবস্থা নিজে করো। ছেলে বলল তার সঙ্গেই আছে। আমি বুঝলাম ছেলে প্লেনে করে ভারতে আসার সময়ও হেরোইন নিয়ে এসেছে। আমি ওকে মাদকমুক্ত করতে নানান জায়গায় সঙ্গে করে ঘুরেছি। ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড—নানা জায়গায়। পরে জেনেছি, এই সময়েও সে মাদক নিয়েছে।

‘মুম্বাইতে ওর চিকিৎসা শুরু হলো। আট মাস পর প্রথম সে বাসায় আসার ছুটি পেল। বেশ ভালোই দেখলাম। কিন্তু তারপর আবারও সে মাদক নিতে শুরু করল। আমি তাকে ১৮ মাসের জন্য মুম্বাইতে আবারও পাঠানোর প্রস্তুতি নিলাম। ইমিগ্রেশন হয়ে যাওয়ার পর বিমানবন্দর থেকে ও পালিয়ে গেল। আমি খুব বিরক্ত হলাম। আমি ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেব না ঠিক করলাম। পরে একজনের সঙ্গে আলাপ করলাম। নামটা বলছি না। আপনারা সবাই চিনে ফেলবেন। তো ও নিজের কাছে দু-তিন দিন রেখে ওকে মুম্বাইতে পাঠাল। ১৮ মাস পর ছেলে ফিরে এল। তারপর আবারও একটু কেমন যেন লাগল। আমরা সবাই সুন্দরবন বেড়াতে যাচ্ছি, ও কিছুতেই যাবে না। খুব বিরক্ত হলাম। বাড়ি থেকে বের করে দিলাম। কোনো টাকাপয়সা দিইনি। ওর মা একটি স্লিপিং ব্যাগ দিয়েছিল। আর আমি দিলাম রিহ্যাব সেন্টারের ফোন নম্বর। ছেলে চলে গেল। ২০০৬ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের কথা বলছি। সাত-আট দিন পর মাকে ফোন করে ও বলল, আর কখনো মাদক ছোঁবে না। ওকে যেন বাসায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আসলে রিহ্যাবের কষ্ট মারাত্মক। আমি একদিন দেখেছি, ও শিল-পাটায় মসলা পিষছে। ১ জানুয়ারি ছিল ওর জন্মদিন। আমি বললাম, ওই দিন সে ফিরতে পারে। ছেলে বাড়ি ফিরল। শ্রমজীবী কর্মক্লান্ত মানুষ যেভাবে ভাত খায়, সেভাবে ভাত খেল। তারপর আর কখনো মাদক ছোঁয়নি ও। আমার যুদ্ধের প্রথম পর্বের সমাপ্তি এখানেই।

‘ছেলের সঙ্গে আমার দূরত্ব কমে এল। আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। কিন্তু ও যখন সুস্থ হয়ে উঠেছে, তত দিনে আমার ছোট ছেলেটার আচরণ বদলাতে শুরু করেছে। আমরা ওকে মালয়েশিয়ায় পড়তে পাঠিয়েছিলাম। তিন মাসের টাকা এক মাসে শেষ করে, আবারও টাকা চাইল। আমরা বুঝলাম কোথাও একটা গড়বড় হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় গিয়ে স্টুডেন্ট কাউন্সেলরের কাছ থেকে ওর রুটিনটা চেয়ে নিলাম। দেখলাম, ও ১২টার আগের ক্লাসগুলো করছে না। মায়ের কাছে ছেলে স্বীকার করে নিল ও ড্রাগ ধরেছে। যে ড্রাগটা সে নিত, ওটা ইয়াবার চেয়েও শক্তিশালী। ছেলে বলল, সে রিহ্যাবে যাবে। সুস্থ হবে। ওকে মুম্বাইতে পাঠালাম। সুস্থ হয়ে ফিরল। ছেলেটা আমার ভালো মিউজিশিয়ান। রিহ্যাবে থাকা অবস্থায় ওদের চার বন্ধুর একটা অ্যালবাম বেরিয়েছিল। সিটিসেল-চ্যানেল আই পুরস্কারও পেয়েছিল। প্রায়ই ওকে দেখে থাকবেন আপনারা। বড় বড় আসরে মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে। ও এখন আমার সঙ্গে ছায়ার মতো থাকে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, হয়তো ব্যবসায় আরও ভালো করতে পারতাম। কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। তবে এখন আমি সুখী। ছেলেরা ভালো করছে। বড়টি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করছে। নাতি হয়েছে আমার একটা। আর ছোটটা তো ছায়ার মতো আমার সঙ্গেই আছে। আমরা এখন একটা রিহ্যাব সেন্টারও দিয়েছি। ভালোই চলছে। আসলে মাদকাসক্তদের জন্য যথাযথ চিকিৎসা আর ভালোবাসা—এ দুটোর খুব প্রয়োজন। আমাদের রিহ্যাব সেন্টারটা একটু ব্যয়বহুল। এখনকার চেয়েও আরও বড় পরিসরে রিহ্যাব সেন্টার করার স্বপ্ন দেখি। মানসিক রোগের নানা বিষয়-আশয়ের খোঁজখবর করি। আমার ছেলেদের মতো অন্যদেরও মাদকমুক্ত করব—এই স্বপ্ন দেখি। এই বেশ ভালো আছি।’

সূত্রঃ প্রথম আলো 

Comment