No icon

একলা বেরিয়ে কোথায় গেলেন তবে মেহেরা?

আট মাস ধরে মেয়ের জন্য চোখের জল ফেলছেন মা। মেয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। থানা-পুলিশ থেকে শুরু করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) ধরনা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। এমনকি বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানকেও কাজে লাগিয়েছেন মেয়েকে খুঁজে দিতে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মেয়েকে। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! মেয়েটি বেঁচে আছে তো? এমন শঙ্কায় এখন বুক কাঁপে মায়ের।

নিখোঁজ মেয়েটির নাম মেহেরা জান্নাত (১৮)। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল ইউনিয়নের রাঢ়িখাল গ্রামে তাঁর বাড়ি। সরকারি শ্রীনগর কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। চার বছর আগে পর্তুগালপ্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে মুঠোফোনে বিয়ে হয় তাঁর। শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলছেন, আট মাস আগে কাউকে কিছু না বলে তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন। তাঁরা বলতে পারছেন না মেহেরা নিখোঁজ হওয়ার কারণ। এদিকে থানা-পুলিশ মনে করছে, স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে আছেন মেহেরা।

পুলিশের কথা মানতে রাজি নয় মেহেরার পরিবার। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও মানতে নারাজ। যেভাবেই হোক, মেয়ের খোঁজ পেতে চান মা ফারজানা জান্নাত। শুরুতে একদিন মেয়ের ফোন পেয়েছিলেন মা। এরপর থেকে সেই নম্বরও বন্ধ। কোথায় আছেন তবে মেহেরা?

কী ঘটেছে মেহেরার সঙ্গে, তা রহস্যই রয়ে গেছে দুই পরিবারের কাছে। এত কম বয়সী একটি মেয়ে কি তাঁর বাল্যবিবাহ মেনে নিতে পারেননি? তিনি কি নিজেই তাঁর জীবন নিয়ে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? নাকি বন্দী হয়ে আছেন কোথাও? বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন? এমন নানা প্রশ্ন এখন মেহেরার অন্তর্ধানের পেছনে।

মেহেরার পরিবার, শ্বশুরবাড়ি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা থেকে গত বছরের ৩১ জুলাই মেহেরা জান্নাত নিখোঁজ হন। চার বছর আগে শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর ইউনিয়নের ষোলঘর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের ছেলে শাহরিয়ার হোসেনের সঙ্গে শিশির আহমেদের মেয়ে মেহেরা জান্নাতের বিয়ে হয়। সাড়ে চার বছর ধরে শাহরিয়ার হোসেন পর্তুগালে রয়েছেন। সেখানে যাওয়ার ছয় মাস পর তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে মেহেরার বিয়ে হয়। বিয়ের চার বছর হয়ে গেলেও স্বামী-স্ত্রীর কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি।

মেহেরার মা ফারজানা জান্নাত জানান, বিয়ের সময় মেহেরা অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন। মুঠোফোনে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হতো মেহেরার। এই চার বছরের মধ্য নিয়মিত তিনি শ্বশুরবাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কারও সঙ্গে মেহেরার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তিনি জানান, গত বছরের ৩১ জুলাই মেহেরা শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সন্ধ্যার পরও বাড়ি না ফিরলে আশপাশের এলাকায় খোঁজ করা হয়। পরদিন ১ আগস্ট মেহেরার নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়ে শ্রীনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

মা ফারজানা জানান, ১ আগস্ট বিকেলে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করেন মেহেরা। রাজধানীর গাবতলীতে একটি এলাকায় আছেন এবং সেখানে তাঁর চাকরি হয়েছে বলে জানান। শুধু এটুকু তথ্য দিয়ে মেহেরা ফোন কেটে দেন। এরপর ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে এক ব্যক্তি ফোন ধরেন। তিনি নিজেকে হোটেল ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেন। এর কিছুদিন পর থেকে ওই নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। মেহেরার ব্যবহৃত ফোনের নম্বরটিও বন্ধ রয়েছে।

মেহেরার নানি শেফালি বেগম মেহেরার মাকে দেখিয়ে বলেন, ঘটনার পর থানায় জিডি করা হয়। পুলিশ কোনো হদিস না দিতে পারায় পরে মেহেরার বাবা-মা র‍্যাব ও ডিবির কাছে গিয়ে মেয়ে নিখোঁজের বিষয় জানান। এরপর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও মেয়েকে খুঁজে দিতে টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারেনি মেহেরার। ঘটনার মাস খানেক পর মেহেরার নিখোঁজের কথা জানিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তিও দেন তাঁরা। তিনি বলেন, মেহেরা বাড়ি থেকে এভাবে চলে যাবেন—এটা বিশ্বাসযোগ্য না। তাঁর এভাবে নিখোঁজ থাকা পরিবারের সবাইকে অজানা আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। তিনি জানান, মেহেরার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মেহেরার চার বছর বয়সী ছোট ভাই রয়েছে।

মেহেরার মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কত জায়গায় গেলাম, মেয়েকে তাও খুঁজে পাই না। কেউ খোঁজ দিতে পারেনি। মাসের পর মাস ধরে র‌্যাব, পুলিশ, ডিবির দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। মেয়ের ফোন বন্ধ হওয়ার স্থান ও তার খোঁজ করার জন্য একটা প্রতিষ্ঠানকে টাকাও দিয়েছি। যে যেখানে মেয়েকে খোঁজার জন্য যেতে বলেছে, সেখানেও গিয়েছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি একটু চেষ্টা করতেন, তাহলে হয়তো মেয়েটার খোঁজ পেতাম। আমার মেয়েটা বেঁচে আছে, নাকি কেউ মেরেই ফেলেছে, তা জানতে পারতাম।’

মেহেরার শ্বশুর সিরাজুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন বাজারে তাঁদের ওষুধের দোকান থেকে মেহেরা ১০০ টাকা নিয়ে বের হয়ে যান। সন্ধ্যার সময় বাড়ি না ফেরায় তাঁরা মেহেরার বাবার বাড়িতে খোঁজ করেন। ভেবেছিলেন, সেখানেই গেছেন। খোঁজ না পেয়ে পরদিন মেহেরার পরিবারের সঙ্গে তাঁরা থানায় যান। তিনি বলেন, মেহেরা এভাবে কাউকে না বলে কোথাও যাওয়ার মতো মেয়ে নন। তাঁরা খুবই চিন্তিত। মেহেরার স্বামী বারবার ফোন করে স্ত্রীর খোঁজ পাওয়া গেছে কি না, তা জানতে চান।

এ ঘটনার ব্যাপারে জানতে শ্রীনগর থানায় যোগাযোগ করা হলে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফরিদ উদ্দিন জানান, মেহেরার পরিবার থেকে বারবার থানায় এসে তাগাদা দেওয়ার তথ্য সত্য নয়। তাঁরা একবারই এসেছিলেন। তাঁর মতে, মেহেরা স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছেন। তিনি বলেন, শ্রীনগর থানার অনেক বিবাহিত যুবক বউ রেখে বিদেশ থাকেন। এমন পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আরও ঘটেছে।

Comment