No icon

কিসের টানে ২৬ বছর পর দেশে ফেরা?

মাশি সাইগানিরা চার ভাই ও এক বোন। তাঁর বাবা ডাক্তার ও মা আইনজীবী। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান ছেড়ে তাঁরা পাড়ি জমান জার্মানিতে। ২৬ বছর পর ২০১৫ সালে আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো ফিরে আসেন সাইগানি। দুই যুগেরও বেশি সময় পরে তাঁর দেশে ফেরাটা আফগানিস্তান জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য।

হামাগুড়ি দেওয়ার বয়সে বাবার হাত ধরে মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন জার্মানিতে। চারবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নদের দেশে কেটেছে শৈশব থেকে কৈশোর আর যৌবনও। কিন্তু তারুণ্যের গৌধূলিলগ্নে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন এবার দেশে ফেরা যাক। দীর্ঘ ২৬ বছর পর মাশি সাইগানি তাই ফিরেছেন জন্মভূমি আফগানিস্তানে।
ভারতীয় ক্লাব আইজল এফসির হয়ে এএফসি কাপ খেলতে ২৯ বছর বয়সী সাইগানি ঢাকায় এসেছিলেন। মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে শোনালেন নিজের জীবনের গল্পের সারাংশ।
কাবুলের বনেদি পরিবারে জন্ম সাইগানির। ডাক্তার বাবা ও আইনজীবী মায়ের শাসন ও স্নেহে ভালোই চলছিল চার ভাইবোনের জীবন। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁদের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ১৯৮৯ সালে তাই স্বদেশের মায়া ছেড়ে পাড়ি জমালেন জার্মানিতে। স্কুলের পড়াশোনার সঙ্গে ধীরে ধীরে ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় ঘটে সাইগানির। কৈশোরে পড়লেন প্রেমে। না, কোনো নারী নন, ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলেন সাইগানি।
ফুটবল তাঁকে দুহাত ভরে না দিলেও হতাশ করেনি। জার্মানির চতুর্থ ও পঞ্চম ডিভিশনে ১১ বছর খেলেছেন। আর ২৬ বছর পর সাইগানির জন্মভূমিতে ফেরার নেপথ্য কারণও ফুটবল!
২০১৫ সাফ ফুটবলের আগে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে আফগানিস্তান ফুটবল ফেডারেশন। শক্তিশালী জাতীয় দল গঠনের জন্য জার্মানি এবং আশপাশের দেশগুলোতে অবস্থানরত আফগান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জন্য ব্যবস্থা করা হয় বাছাইয়ের। সেই পরীক্ষায় নাম লিখিয়ে সাইগানি আফগান জাতীয় দলের কোচের মন জেতেন। পরে তো কেরালায় অনুষ্ঠিত সাফ টুর্নামেন্টে দুই গোল করে দেশকে রানার্সআপ করতে বড় ভূমিকাও রেখেছিলেন ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এই হোল্ডিং মিডফিল্ডার।
সাইগানি দেশ ছেড়েছিলেন মাত্র ২ বছর বয়সে। দুই যুগেরও বেশি সময় পরে আফগানিস্তানে ফিরলেও দেশে থাকতে পেরেছেন মাত্র দুই দিন। এ নিয়ে তাঁর আফসোস, ‘সাফের আগে ক্যাম্পে যোগ দেওয়াটা ছিল আমার জন্য ২৬ বছর পরে আফগানিস্তানে ফেরা। কিন্তু মাত্র দুই দিন থাকতে পেরেছি। কারণ তখনো প্রতিদিনই বোমার শব্দ শোনা যেত। পরে কাবুল থেকে ক্যাম্প সরিয়ে দেশের বাইরে নেওয়া হয়।’ সাইগানি তবু দুই দিনের জন্য জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিবারের দেশে ফেরার কোনো আগ্রহ নেই।
মাশি সাইগানি। ছবি: সংগৃহীতমাশি সাইগানি। ছবি: সংগৃহীতসাফে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করার পর ভারতীয় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন দীর্ঘদেহী এই আফগান। এ সুযোগেই জার্মানির বাইরে এসে প্রথমবারের মতো নাম লেখান ভারতের ঘরোয়া লিগে। ভারতীয় আই লিগের ২০১৬-১৭ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন আইজল এফসিতে যোগ দিয়েছেন গত বছর। মৌসুম শেষ করেই আবার ফিরে যাবেন জার্মানিতে।
কিন্তু সাইগানি তো আফগানিস্তান দলে নিয়মিত, তাহলে মৌসুম শেষে কেন দেশে ফেরা নয়? জবাবটা যেন তাঁর ঠোঁটে লেগেই ছিল, ‘আপনি হয়তো জানেন, দুই দিন আগেও ৬০ জন জন মারা গিয়েছে বোমার আঘাতে, যা সব সময় হয়ে আসছে। এমন অবস্থায় কি দেশে ফেরা যায়?’
সাইগানির এই কথা শুনলে মনে হতে পারে জাতীয় দলে খেললেও দেশের প্রতি তাঁর কোনো মায়া জন্মায়নি। ভুল। মাঠে নামলে তাঁর জার্সির নিচে গেঞ্জিতে লেখা থাকে, ‘প্রে ফর আফগানিস্তান’—আফগানিস্তানের জন্য প্রার্থনা করুন।
ভারতে সদ্য সমাপ্ত সুপার কাপে সাইগানির দল জিতলে দৃশ্যটি নিয়মিতই দেখা যেত। জার্সি উঁচিয়ে নিচের গেঞ্জিতে এই লেখা তুলে ধরতেন ভারতীয় গণমাধ্যমের সামনে। ২৬ বছর পরে যিনি দেশের টানে ফিরে আসতে পারেন, তাঁর এই দোয়া চাওয়াই তো দেশপ্রেম।

সূত্রঃ প্রথম আলো 

Comment