No icon

বিতর্ক এড়িয়ে বাজেট প্রণয়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ওপর আস্থা রেখে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী রাজস্ব বাজেট প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে গত সোমবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া সব ধরনের বিতর্ক এড়াতে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এনবিআরের সাজানো রাজস্ব বাজেট প্রয়োজন হলে আগামী ৭ জুনের আগে এক বৈঠকে কাটছাঁট করার কথা বলেছেন তিনি। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।    

আগামী অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে  এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে এনবিআর বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তারা গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গণভবনে যান। অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে টানা ওই বৈঠক চলে রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এনবিআর থেকে আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া দুই লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা কমানোর আবেদন করলেও প্রধানমন্ত্রী তা অর্থমন্ত্রীর মতামতের ওপর ছেড়ে দেন। লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে রেখে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চেষ্টা করা উচিত বলে মত দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করা হচ্ছে। এ ধারা থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ সম্পদের পূর্ণ ব্যবহারে দেশকে এগিয়ে নিতে কৌশলী হতে হবে। তবে এ জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাড়তি কর নেওয়া যাবে না। বরং যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত করতে কর আদায়ের নির্দেশ দেন এনবিআর কর্মকর্তাদের।

এ ছাড়া আগামী দিনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইনের আওতায় বকেয়া আদায়ে এনবিআরকে জোর দিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রয়োজন হলে আগামী বাজেটে এ বিষয়ে উপযোগী আইন করতেও বলেন তিনি।

বৈঠকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এফবিসিসিআইয়ের সুপারিশগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এর মধ্যে করপোরেট কর হারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

প্রসঙ্গত, করপোরেট কর হার বিষয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাব হচ্ছে—‘করপোরেট কর হারের ক্ষেত্রে ব্যাংক বীমা, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফোন অপারেটর, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সিগারেট প্রস্তুতকারক কম্পানি ছাড়া অন্য সব কম্পানির ক্ষেত্রে  বাংলাদেশে নিবন্ধিত কম্পানি থেকে লব্ধ লভ্যাংশ আয় ব্যতিরেকে অন্য সর্ব প্রকার আয়ের ওপর পাবলিকলি ট্রেডেড কম্পানি হলে ২২.৫ শতাংশ, নন-পাবলিকলি ট্রেডেড কম্পানির ক্ষেত্রে ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পানি (মূসক নিবন্ধিত) হলে ৩০ শতাংশ, নন-ম্যানুফ্যাকচারিং বা ট্রেডিং কম্পানি হলে ৩২.৫ শতাংশ। ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (মার্চেন্ট ব্যাংক ব্যতিরেকে) পাবলিকলি ট্রেডেড কম্পানি হলে ৩৭.৫ শতাংশ, নন-পাবলিকলি ট্রেডেড কম্পানি হলে ৪০ শতাংশ। মার্চেন্ট ব্যাংক হলে ৩৫ শতাংশ। বাংলাদেশে নিবন্ধিত কম্পানি থেকে লব্ধ লভ্যাংশ আয়ের ওপর কম্পানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ। কম্পানি ব্যতীত  ই-টিআইএন ধারী অন্য করদাতাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ। কম্পানি ব্যতীত ই-টিআইএন ছাড়া অন্য করদাতাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত নয়—এমন বিদেশি কম্পানির প্রত্যাবাসনযোগ্য মুনাফার ওপর ২০ শতাংশ। রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার দশমিক ৫ শতাংশ, ন্যূনতম কর হার দশমিক ৫ শতাংশ।’

তবে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আগামী দিনে এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাব না মেনে কয়েক অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে গ্রহণযোগ্য কর হারে নিয়ে আসতে যুক্তি তুলে ধরেন।

গণভবনের বৈঠকে আগামী অর্থবছরের জন্য ভ্যাট (ভেলু এডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হিসেবে নির্ধারণে অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি প্রধানমন্ত্রী সম্মতি জানান।

আগামী অর্থবছরে চলতিবারের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৮৩ হাজার কোটি টাকার চেয়ে বাড়িয়ে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায়ে আপত্তি জানাননি প্রধানমন্ত্রী। তবে অনলাইনের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে তিনি ইতিবাচক মত দিয়ে অনলাইনে ভ্যাট আদায় অবশ্যই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’ তবে ব্যবসায়ীরা অনলাইনে ভ্যাট দিতে গিয়ে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার যেন না হয় সে বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানকে সতর্ক করেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার তাগাদা দিয়ে বলেন, ‘কর অবকাশ সুবিধা, কাঁচামাল আমদানিতে রাজস্ব ছাড়, আইন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।’ বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগমুখী করতে বেশি গুরুত্ব দিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগমুখী হলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়ার পক্ষেই থাকেন প্রধানমন্ত্রী।

অর্থপাচার রোধে এনবিআরকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা অর্থপাচার করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেন।’ তখন জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ আগামী দিনে বিনিয়োগের সুযোগ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন অর্থমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না তা নিয়ে এনবিআরকে হিসাব কষতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

করমুক্ত আয়সীমা না বাড়ানোর পক্ষে এনবিআর বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করেননি।

বিভিন্ন অপ্রচলিত খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে নতুন কৌশল নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখন নতুন ধারায় ব্যবসা বাণিজ্যে অনেকে এগিয়ে আসছে। বিষয়গুলো লক্ষ করবেন। তরুণ প্রজন্ম আইনে থেকে কাজ করতে চায়, তাদের সে সুযোগ দিতে হবে। ভোগান্তিমুক্তভাবে কর দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’ আগামী অর্থবছরে অনলাইনে আয়কর আদায়ে আরো জোরালো পদক্ষেপ নিতে এনবিআরকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

সূত্রঃ কালেরকন্ঠ 

Comment