No icon

বড় প্রকল্পের ছোট অগ্রগতি

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু ছাড়া অন্যগুলো বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই। এসব প্রকল্পের একটিও বর্তমান সরকারের মেয়াদে শেষ হবে না।

এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতুর কাজই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এটির মূল অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এই প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে। মেট্রোরেলের মূল কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ—এসব বড় প্রকল্পের কাজ ১৫ শতাংশও এগোয়নি। আবার অন্য কয়েকটির মূল কাজই এখনো শুরু হয়নি।

বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়, সেগুলোকে ‘ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ তালিকায় ১০টি প্রকল্প আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আলট্রা সুপার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (মেট্রোরেল প্রকল্প), পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছাকাছি গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন দ্বৈতগেজ রেলপথ, মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্পওয়ারি বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদে অর্থাৎ ২০১৮ সালের মধ্যে অগ্রাধিকার তালিকার একটি প্রকল্পও শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে বড় প্রকল্পগুলোর জন্য অবশ্য বেশি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বড় প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত হারে বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে বলে মনে করেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব ফাওজুল কবির খান। তিনি গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, এসব প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। যে প্রকল্পে লাগত পাঁচ হাজার কোটি টাকা, সেটির জন্য রাখা হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। আবার কোনো প্রকল্প লাগবে পাঁচ বছর, মেয়াদ রাখা হয়েছে তিন বছর। এসব কারণে যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। আবার প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে কর্মকর্তাদেরও দক্ষতার অভাব আছে। প্রকল্পের মালামালও সঠিক সময়ে আনা হয় না। সার্বিকভাবে প্রকল্পের খরচ ও সময় বাড়লে এর অর্থনৈতিক সুবিধা কমে যায়।

ফাওজুল কবির খান আরও বলেন, মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসে বড় বড় বেশ কিছু প্রকল্প বাদ দিয়েছেন। তাই কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে সেটির ব্যয়-সুবিধা অনুপাত বিশ্লেষণ করার তাগিদ দেন ফাওজুল কবির খান।

তবে বর্তমান সরকার আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বড় প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান করতে চায়। এ জন্য নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ কয়েকটি প্রকল্পের গতি বাড়ানো হয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিপুল পরিমাণ বরাদ্দও রাখা হয়েছে।

 

পদ্মা সেতু

বর্তমান সরকারের নেওয়া সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার প্রকল্প হলো পদ্মা সেতু। বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি বাস্তবায়নের অগ্রগতিই সবচেয়ে বেশি। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের তিনটি স্প্যান বসানো হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। পরে একাধিকবার সংশোধনের পর এখন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকায়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বরাদ্দের ৫২ শতাংশের বেশি অর্থ খরচ হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ১৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের জন্য আগামী বাজেটে ৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রকল্পটি আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই সরকারের মেয়াদে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে না। কারণ সরকার এটির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দই রাখেনি।

 

মেট্রোরেল

রাজধানীতে সবচেয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন উদ্যোগ হলো মেট্রোরেল প্রকল্প। এর আওতায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেলপথ হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ঘণ্টায় ২২ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করতে পারবে। রাজধানীবাসীরও এই প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ আছে। কিন্তু প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ এগিয়ে গেলেও আশার সঞ্চার করতে পারছে না। ২০১৯ সালে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ট্রেন চলাচল চালু হওয়ার কথা। আর ২০২৪ সালে শেষ হবে পুরো প্রকল্পের কাজ।

২০১২ সালে নেওয়া এই প্রকল্পের প্রথম ছয় বছরে অগ্রগতি মাত্র ১৩ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের এ উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। রাশিয়ার অর্থায়নে হচ্ছে এই প্রকল্প। টাকার অঙ্কে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। গত দুই বছরে প্রকল্পটিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। তবে আগামী অর্থবছরে একক প্রকল্প হিসেবে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পটির জায়গা অধিগ্রহণসহ প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প শেষ হয়েছে।

মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

২০১৪ সালে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল, ২০২৩ সালের মধ্যে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হবে। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন হার প্রায় ১৪ শতাংশ।

২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প এলাকা থেকে বিদেশি প্রকৌশলীরা দেশে চলে গিয়েছিলেন। এ জন্য প্রায় সাত-আট মাস কাজ অনেকটাই বন্ধ ছিল। তবে বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা ও নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ

পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ তৈরির জন্য চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের এই প্রকল্প পাস করা হয়েছে।  প্রকল্পটির আরেকটি শাখা দোহাজারী থেকে রামু হয়ে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত নেওয়ার কথা। এক দফা ব্যয় বৃদ্ধির পর এই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা; মেয়াদ ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত।

সূত্রঃ প্রথম আলো 

Comment