No icon

দুই গলিতে জমজমাট ব্যবসা

স্যান্ডো গেঞ্জি, টি-শার্ট, পলো শার্টসহ বাচ্চাদের পোশাকের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা চলছে দুই গলির এক ঘিঞ্জি এলাকায়। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের মতো এখানকার ভবনগুলোও গায়ে গায়ে লাগানো। ভবনের নিচতলায় দোকান, ওপরে কারখানা।

হোসিয়ারি পণ্যের এই জমজমাট ব্যবসা হয় নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি এলাকায়। একেকটি কারখানায় ৫ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করেন। ঢাকাসহ সারা দেশের ব্যবসায়ীরা পাইকারি দরে এসব পণ্য কিনতে আসেন এখানে। ফলে সকাল থেকে রাত অবধি ব্যবসায়ী–শ্রমিকের পদচারণে মুখর থাকে নয়ামাটি।

সম্প্রতি এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শনকালে ব্যবসায়ীরা বলেন, সারা দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে নয়ামাটির হোসিয়ারিপল্লি। এখানকার পোশাকের দাম হাতের নাগালে হওয়ায় প্রতিবছর চাহিদা বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যবসায়ীর সংখ্যাও। ফলে ব্যবসায় প্রতিযোগিতাও তীব্র।

শীতলক্ষ্যা নদীর তীরঘেঁষা নারায়ণগঞ্জ শহরের নয়ামাটিতে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে হোসিয়ারি পণ্য উৎপাদন শুরু হয়। শুরুতে শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি ও নারী-পুরুষের অন্তর্বাস তৈরি হলেও নব্বইয়ের দশকে যুক্ত হয় ট্রাউজার, টি-শার্ট, পলো শার্ট, সোয়েটার, মাফলার, টুপি, মোজা, বাচ্চাদের পোশাক ইত্যাদি উৎপাদন। উৎপাদন ও বিক্রি এক জায়গাতেই।

পাশাপাশি পলিব্যাগ, বোতাম, লেবেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির কারখানাও আছে এখানে। ফলে হোসিয়ারি ব্যবসা নয়ামাটি থেকে শহরের উকিলপাড়া, দেওভোগ, সোহরাওয়ার্দী মার্কেট ও থানার পুকুরপাড়ে বিস্তৃত হয়েছে। হোসিয়ারি ঐতিহ্যের কারণেই নারায়ণগঞ্জে রপ্তানিমুখী নিট পোশাক কারখানা গড়ে ওঠা সহজ হয়েছে।

শহরের ২ নম্বর রেলগেট পার হয়ে বাসস্ট্যান্ড সড়ক ধরে খানিকটা এগিয়ে ডানের গলিতে ঢুকলেই নয়ামাটি। কয়েকটি দোকানের পরই ৭৩ বছরের পুরোনো অসীম টেক্সটাইল। এ কারখানায় দিনে ৪৮ ডজন স্যান্ডো গেঞ্জি উৎপাদিত হয়। শ্রমিক খাটেন ১৪ জন।

অসীম টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী তাপস সাহা বলেন, টি-শার্ট জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে তরুণদের মধ্যে স্যান্ডো গেঞ্জির চাহিদা কমেছে। যুগের চাহিদা মেটাতে স্যান্ডো গেঞ্জির পাশাপাশি নিত্যনতুন পোশাক যুক্ত হওয়ায় এ এলাকার ব্যবসার পরিধিও বেড়েছে।

নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারি পোশাক প্রস্তুত ও বেচাবিক্রির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশন বলছে, তাদের সমিতির সদস্য-প্রতিষ্ঠান আছে ১ হাজার ৪০০। এর বাইরেও হাজার পাঁচেক প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক লাখ শ্রমিক কাজ করেন। কেবল নয়ামাটিতেই বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম বলেন, ‘গত বছর কমপক্ষে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। এবারের রোজার ঈদের পর এখনো হিসাব করা হয়নি। তবে গতবারের চেয়ে ব্যবসা  বেড়েছে।’

নয়ামাটির পুরোনো ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি রহমান হোসিয়ারি। তাদের কারখানায় দিনে দেড় শ ডজনের মতো স্যান্ডো গেঞ্জি উৎপাদিত হয়। তাদের রহমান স্পেশাল ও নবারন ব্র্যান্ডের স্যান্ডো গেঞ্জি খুলনা অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়—এ তথ্য দিয়ে রহমান হোসিয়ারির কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসা প্রতিবছরই বাড়ছে।

৩৫ বছর ধরে নয়ামাটিতে ব্যবসা করছে গুডলাক হোসিয়ারি। তাদের কারখানায় প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ ডজন স্যান্ডো গেঞ্জি উৎপাদিত হচ্ছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের পণ্য বিক্রি হয়। মানভেদে এক ডজন গেঞ্জির দাম ৩৩০–৬১০ টাকা।

গুডলাক হোসিয়ারির স্বত্বাধিকারী মণীন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, দুই ঈদে বেশি বেচাবিক্রি হয়। বাকি সময় দিনে গড়ে দেড় শ ডজন গেঞ্জি বিক্রি হয়।

বাচ্চাদের পোশাক বিক্রয়কারী অর্চনা প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী হরেকৃষ্ণ ঘোষ বলেন, ‘ভারত থেকে পোশাকের নমুনা কিনে আনি। সেই নকশা দেখে নিজের কারখানায় পোশাক বানাই।’ তিনি বলেন, ‘স্যান্ডো গেঞ্জির ব্যবসায় অনেক পুঁজি লাগে। তাই বাচ্চাদের পোশাকের দিকে ঝুঁকেছি।’

নয়ামাটির পাইকারি দোকানগুলোতে একেকজনের ক্রেতা একেক এলাকার ব্যবসায়ী। যে প্রতিষ্ঠান খুলনার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা করে, তারা সিলেট বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীর সঙ্গে করে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. আবদুল হাই বলেন, সবাইকে বাকিতে পণ্য বিক্রি করতে হয়। পুঁজির সীমাবদ্ধতার কারণেই একসঙ্গে অনেক জেলার পাইকারদের সঙ্গে ব্যবসা করা যায় না।

সম্প্রতি সরেজমিনে নয়ামাটি এলাকা ঘুরে দেখা গেল, সরু সড়কের কারণে চলাফেরায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় সবাইকে। আর অপ্রশস্ত ড্রেনের কারণে ভারী বৃষ্টিতে পানি জমে যায়।

নাজমুল আলম জানান, এখানে অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। বাকিতে ব্যবসা বেশি হয় বলে পুঁজির সংকটে পড়েন তাঁরা। সরকার যদি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।

সূত্র; প্রথম আলো 

Comment