No icon

বৈশাখী বেচাবিক্রিতে অর্থনীতি চাঙা

• বৈশাখী কেনাকাটার উৎসব চলছে। 
• অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে। 
• কত টাকার ব্যবসা, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। 
• কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয় বলে ধারণা।

ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটের সামনের ফুটপাতে ছয় বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের পোশাক বিক্রি করেন হকার জাহিদুল ইসলাম। সপ্তাহখানেক ধরে ‘এসো হে বৈশাখ’ লেখা গেঞ্জি নিয়ে বসেছেন। বাচ্চাদের এসব গেঞ্জি এক দাম ৫০ টাকা।

বৈশাখ উপলক্ষে ২ হাজার গেঞ্জি তৈরি করেছেন জাহিদুল। গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি বলেন, ‘গত বছর নববর্ষের আগের এক সপ্তাহ প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছি। এবার ৪০০ পিস বিক্রি করছি। আশা করছি শেষের দিন ভালো ব্যবসা হবে।’

ফুটপাত থেকে শুরু করে অলিগলির দোকানপাট কিংবা বিলাসবহুল বিপণিবিতানে বৈশাখী পোশাক কেনাকাটার উৎসব চলছে। অনলাইনেও বৈশাখী পোশাকসহ বিভিন্ন উপকরণ বিক্রি হচ্ছে। বড় ব্র্যান্ড ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক উপহার পাঠিয়ে তাদের গ্রাহকদের বৈশাখী শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।

তিন বছর ধরে সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা-কর্মচারীরাও পাচ্ছেন ভাতা। এভাবে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণের ব্যাপ্তি বাড়ছে। ফলে বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার বড় হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙা করছে।

সরকারি কর্মচারীরা এবার পৌনে ৫০০ কোটি টাকার বৈশাখী ভাতা তুলেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তথ্যটি মিললেও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে সারা দেশে কত টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।

বর্ষবরণের উৎসবে নতুন পোশাকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকে। গত কয়েক দিন রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট, গুলিস্তান ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখী পোশাক কিনতে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নগরীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বৈশাখী পোশাক নিয়ে বসেছেন হকার।

ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ) তথ্য অনুযায়ী, ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছর প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেচাবিক্রি হয়। এর মধ্যে অর্ধেকই রোজার ঈদে। ২৫-২৮ শতাংশ পয়লা বৈশাখে। তার মানে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ফ্যাশন উদ্যোগের সভাপতি আজহারুল হক গত সোমবার বলেন, ‘পয়লা বৈশাখের মূল বেচাকেনা হয় শেষ চার-পাঁচ দিন। এখন পর্যন্ত বেচাবিক্রির যে প্রবণতা, তাতে গতবারের চেয়ে ব্যবসা কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেড়েছে।’ তিনি বলেন, বৈশাখে দেশীয় পোশাক বেশি বেচাকেনা হওয়ায় প্রান্তিক এলাকার তাঁতিরা উপকৃত হন। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে।

গত রোববার থেকে তিন-চার দিন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা উত্তাল ছিল। ফলে শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড ও নিউমার্কেটের বৈশাখী বেচাকেনা বাধাগ্রস্ত হয়। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের ফ্যাশন হাউস ডুয়েট অ্যাড ঐতিহ্যের কর্ণধার অনুপ কুমার পাল বলেন, বৈশাখের বেচাবিক্রি ভালোই হচ্ছিল। তবে আন্দোলনের কারণে সোম ও মঙ্গলবার ব্যবসা হয়নি।

গত দু-তিন বছরের চেয়ে এবার বৈশাখের ব্যবসা ভালো বলে মন্তব্য করলেন ফ্যাশন হাউস শৈলীর কর্ণধার তাহমিনা শৈলী। তিনি বলেন, বৈশাখ সর্বজনীন উৎসব। আগে মানুষজন কেবল নিজেদের জন্যই পোশাক কিনত। এখন বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের জন্য কিনছে। ফলে ব্যবসা বাড়ছে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা শহর, এমনকি প্রবাসে থাকা বাঙালিরাও অনলাইনে প্রচুর ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন বলে জানালেন তিনি।

পয়লা বৈশাখে হালখাতা করতেন ব্যবসায়ীরা। হালখাতায় ক্রেতাদের মিষ্টি-নিমকি খাওয়ান তাঁরা। বর্তমানে হালখাতা উৎসব রং হারালেও মিষ্টি খাওয়ানোর প্রচলন আছে। ফলে বৈশাখে মিষ্টির দোকানের ব্যবসা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।

প্রাণ গ্রুপের মিষ্টির ব্র্যান্ড মিঠাইয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অনিমেষ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে প্রায় ২৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১০ টন মিষ্টির ক্রয়াদেশ পেয়েছি আমরা। সে জন্য সাধারণত প্রতিদিন ২ টন মিষ্টি উৎপাদিত হলেও বৈশাখের আগে উৎপাদন বেড়ে ৫ টনে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমাদের বিক্রয়কেন্দ্রে ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত মিষ্টি বিক্রি ৫ গুণ বেড়ে যায়।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, তিন বছর ধরে সরকারিভাবে বৈশাখী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সীমিত পরিমাণে ভাতা দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিবছরই শহরের নতুন নতুন জায়গায় বৈশাখী মেলা হচ্ছে। বৈশাখের উৎসবটি একসময় গ্রাম থেকে লাফ দিয়ে ঢাকায় এসেছিল। এখন সেটি বিভাগীয় শহরে ও জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কারণে বৈশাখের অর্থনীতির আকার প্রতিবছরই বাড়ছে।

Comment