No icon

চীনকে উপহার দিয়েই যাচ্ছেন ট্রাম্প

একজন বিজনেস গুরু একদা বলেছিলেন, খারাপ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে মানুষ খারাপটাই শেখে।

এই মুহূর্তে ট্রাম্পের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি একজন শিক্ষক হিসেবে স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আমেরিকার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন না করার কায়দা-কানুনবিষয়ক ক্লাস নিচ্ছেন। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের চিন্তাশীল নীতিনির্ধারণের কৌশলগুলো বাদ দিয়েছেন। সবাই আস্থা রাখতে পারে, এমন একটি জাতীয় কৌশলও তিনি এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি।

ট্রাম্প গদিতে বসার প্রথম ১৬ মাসে একের পর এক হঠকারী পদক্ষেপ নিয়ে বহির্বিশ্বে, বিশেষ করে এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাবের ওপর আঘাত হেনেছেন। নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা, নতুন নতুন শুল্ক আরোপ ও পলায়নপর বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তিনি যে বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ উগরে দিয়েছেন, তা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার অবস্থানকে ইতিমধ্যেই দুর্বল করে দিয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন, এতে মাথাচাড়া দেওয়া শক্তিগুলো বেকায়দায় পড়বে। কিন্তু ‘হিতে বিপরীত’ হয়েছে। এসবের মাধ্যমে তিনি উল্টো আমেরিকার প্রতিপক্ষদের সামনে নতুন নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছেন। চীনের বিরুদ্ধে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি তেমনই একটি বিষয়।

অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বাজারকে আরও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বিদেশি কোম্পানির প্রতি নির্ভরতা কমাচ্ছেন; রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য খাতকে শক্তিশালী করছেন এবং বিদেশিদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করার নীতি বাদ দিয়ে উদ্ভাবনের প্রতি জোর দিয়েছেন। এই অবস্থায় চীনকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে অবশ্যই ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকা দরকার। অথচ ট্রাম্প যেসব নীতি নিয়ে এগোচ্ছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রকে উল্টো নিঃসঙ্গ করে ফেলছে।

আমেরিকার এশীয় মিত্রদের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক বন্ধন কী অবস্থায় আছে, তার একটি মোটা দাগের পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে মুক্ত বাণিজ্যের ওপর ট্রাম্পের আস্ফালন কতটা নিষ্ফল ও বায়বীয়। ২০১৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে; অর্থাৎ চীনের চেয়ে সামান্য একটু বেশি। ওই বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রপ্তানির ২৫ শতাংশ হয়েছে চীনে। অস্ট্রেলিয়ার মোট রপ্তানির ২৮ শতাংশ গেছে চীনে; যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে মাত্র ৭ শতাংশ। অবধারিতভাবেই এই অঙ্কগুলোর রাজনৈতিক নিহিতার্থ রয়েছে। সেটি হলো: চীন এখন এশিয়ার মূল ক্রীড়নক এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি বেঞ্চে কোনোরকমে একটি আসন দখল করে আছে। ওবামার আমলে এশিয়ায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ১১টি দেশ মিলে ‘ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ শীর্ষক চুক্তিতে সই করেছিল। ট্রাম্প গদিতে বসার প্রথম মাসেই চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেন। সেই ১১টি দেশের ৭টি দেশ এখন চীনের বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের অংশ হিসেবে আছে।

 চীনের ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া একাত্মতা ঘোষণা করে বটে; একই সঙ্গে দেশটির নেতারা এটিও উপলব্ধি করেন, চীনের সঙ্গে থাকলে দিন শেষে অস্ট্রেলিয়াই লাভবান হয়। অস্ট্রেলিয়ার জিডিপির ২০ শতাংশই অর্জিত হয় দেশটির লোহা এবং কয়লার মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানি থেকে। আর এই রপ্তানির বেশির ভাগ হয় চীনে। ফলে চীনের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুবই দৃঢ়। অস্ট্রেলিয়া এখন শঙ্কায় আছে, চীনের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি তুললে সেটি তাকে ক্ষতির মুখে ফেলে দিতে পারে।

ট্রাম্পের এই বাণিজ্য কৌশল নীতির রেশ শুধু যে এশিয়াতেই আবদ্ধ আছে, তা নয়। লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্প শুধু আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেননি, তিনি সেখানে চীনের ক্রীড়নকদের জায়গা পাকাপোক্ত করে দিচ্ছেন। ওই অঞ্চলে ট্রাম্পের সংরক্ষণনীতির সুযোগ নিয়ে চীন অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। লাতিন আমেরিকার ২০টি দেশের মধ্যে ১২টি দেশে শীর্ষ ৫টি রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় চীন চলে গেছে। গত দশকে এই অঞ্চলে চীন ১৪ হাজার কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২০২৯ সাল নাগাদ সেখানে ২৫ হাজার কোটি ডলার সরাসরি বিনিয়োগ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্প যখন নাফটা চুক্তি বাতিলের হুমকি দিচ্ছেন, বিদেশে সহায়তা বন্ধ করে দিচ্ছেন এবং সীমানাপ্রাচীর গড়ার পরিকল্পনা করছেন, তখন তাঁর প্রতিপক্ষ মুক্ত বাণিজ্যের অগ্রদূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনবার লাতিন আমেরিকা সফর করেছেন এবং গত জানুয়ারিতে বলেছেন, চীনের মহাসড়ক নির্মাণ কর্মসূচি লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে।

এশিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য ট্রাম্পের পূর্বসূরিরা অনেক কষ্ট করেছেন। আর ট্রাম্প এসে এশিয়ায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের গর্তে ফেলে দিচ্ছেন। সম্পর্কের মাঝখানে ধরা এই চিড় মেরামত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অতি দুরূহ হয়ে পড়বে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

কেন্ট হ্যারিংটন সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক

Comment