No icon

ফিলিস্তিনি হত্যার প্রতিবাদ করার বিপদ

গতকালও ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলিতে নিহত হলেন চারজন ফিলিস্তিনি। বলা যায়, ট্রাম্পের জেরুজালেমে দূতাবাস পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর থেকে লাগাতারভাবে প্রতিবাদীদের হত্যা করা চলছে। তা হলেও ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। এর সমালোচনা করলেই ‘অ্যান্টিসেমেটিক’ (ইহুদিবিদ্বেষী) তকমা লেগে যাবে। নোবেল বিজয়ী জার্মান কবি গুন্টার গ্রাসের গায়েও অ্যান্টিসেমেটিক তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছিল। গ্রাসের অপরাধ, ইসরায়েলের বর্বরতা নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। ওই কবিতা প্রকাশের পরই খুঁজে বের করা হয়, গ্রাস শুধু অ্যান্টিসেমেটিকই নন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নাৎসি বাহিনীর সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অবশ্য এই কবিতা প্রকাশের আগে কেউ কিছু জানতেন না, বিষয়টি এমন নয়। গ্রাস যদি ওই কবিতা না লিখতেন, তবে কি তাঁর অতীত পরিচয় বেরিয়ে আসত? যত দিন তিনি জায়নবাদের নৃশংসতা নিয়ে নিশ্চুপ ছিলেন, তত দিন আমরা গ্রাসের অতীত জানতে পারিনি।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, জায়নবাদের পক্ষে থাকলে অতীত যা-ই হোক না কেন, তা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হবে না। তবে একটু গড়বড় হলেই বিপদ। শরীরে তকমা লেগে যাবে। এটাই হচ্ছে জায়নবাদীদের অ্যান্টিসেমেটিক রাজনীতির কূটকৌশল। ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের নৃশংসতা, বর্বরতা দেখেও না দেখান ভান করে থাকতে হবে। তবেই মানবতাবাদী বলে বিবেচিত হওয়া যাবে। অন্যথায় নাৎসি হিটলারের কাতারে নিয়ে যাবে।

অ্যান্টিসেমেটিক বিতর্ক নিয়ে ইউরোপের গণমাধ্যম সম্প্রতি আবারও সরগরম। বিতর্কের শুরু নেদারল্যান্ডসের কমেডিয়ান জানে ভ্যালিসের এক প্যারোডি গান নিয়ে। সম্প্রতি ইউরোভিশন জয়ী ইসরায়েলের প্রতিযোগী নেতা বারজিলাইয়ের ‘আই অ্যাম নট ইওর টয়’ গানটির প্যারোডি করেন ভ্যালিস। নেদারল্যান্ডসের একটি টিভি চ্যানেলে ওই প্যারোডি গান প্রচার করা হয়। প্রচারের পরের দিনই ইসরায়েলের হেগ দূতাবাস নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দেশটির কেন্দ্রীয় ইহুদি সংগঠনের কাছে অ্যান্টিসেমেটিজমের অভিযোগ করে ভ্যালিস ও টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে, গানটি প্যারোডি করে ইসরায়েলকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এটা নাকি অ্যান্টিসেমেটিক আচরণ।

কীভাবে ইসরায়েল হেয়প্রতিপন্ন হলো? বারজিলাইয়ের মতো একই পোশাক পরে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নীতির প্রতিবাদ করে গান পরিবেশন করেছেন জানে ভ্যালিস। প্যারোডির বাংলা করলে মোটামুটি এ রকম দাঁড়ায়;

দেখো কী সুন্দর করে আমি মিসাইল ছুড়ছি

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পূর্তি ঘিরে ভ্যালিস গেয়েছেন,

আমরা পার্টি উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছি
তুমি কি আসবে?
আল-আকসা মসজিদে
সহসাই এটি খালি করে ফেলা হবে।
ফিলিস্তিনিরা এই পার্টিতে নিমন্ত্রিত নয়।

শুধু গানটির প্যারডিই করেননি ভ্যালিস, যে মঞ্চে এই গান ধারণ করা হয়েছে, তার পেছনে বিশাল এক পর্দায় সম্প্রতি গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার দৃশ্যও দেখানো হয়। এই গান প্রচারের পরই ইসরায়েলে নীতিনির্ধারকেরা খেপে ওঠেন। হেগের ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেও বলেছেন, এভাবে প্যারোডি করা ঠিক হয়নি।

গানটি প্রচারের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এবং এটা কীভাবে অ্যান্টিসেমেটিক আচরণ, তা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন কেউ কেউ। এখানে ইহুদিধর্ম সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। ইসরায়েল রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে কথা বলা হয়েছে। এখানেই রয়েছে অ্যান্টিসেমেটিক রাজনীতি। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলা, হত্যাযজ্ঞ নিয়ে কথা বললেই অ্যান্টিসেমেটিক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সমূহ শঙ্কা আছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন কৃতকর্মের জন্য ইউরোপও এ বিষয়ে খুব বেশি খোলামেলাভাবে মন্তব্য করে না।

জায়নবাদীদের অ্যান্টিসেমেটিক রাজনীতি থেকে ফ্রান্সের বিখ্যাত স্যাটেয়ার ম্যাগাজিন শার্লি এবদোও রক্ষা পায়নি। নিজেদের মতামত প্রকাশে অটল থাকার ইতিহাস আছে শার্লি এবদোর। শার্লি এবদোয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কার্টুন প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। শার্লি এবদোতে হামলাও হয়েছে। কিন্তু শার্লি এবদো কার্টুন প্রত্যাহার করেনি। যিশু ও খ্রিষ্টধর্ম নিয়েও কৌতুককর কার্টুন ছাপিয়েছে শার্লি এবদো। ভেসে আসা তুর্কি শরণার্থী শিশু আয়লান কুর্দিকে নিয়েও মশকরা করেছে তারা। কখনোই নিজস্ব অবস্থান থেকে পিছু হটেনি শার্লি এবদো। কিন্তু ২০০৯ সালে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির ছেলে ও এক ইহুদি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এক কার্টুন ছাপায় শার্লি এবদো। পরে ইহুদিদের প্রতিবাদের মুখে ওই কার্টুন প্রত্যাহার করা হয় এবং ২০১৫ সালে কার্টুনিস্টকে অ্যান্টিসেমেটিক ভূমিকার কারণে বরখাস্ত করা হয়। ইহুদিদের অনুভূতিতে আঘাত লাগার কারণে যদি কৌতুক প্রত্যাহার করা হয়, কার্টুনিস্টকে প্রত্যাহার করা হয়, তবে মুসলমান বা খ্রিষ্টানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগার কারণে কেন কার্টুন প্রত্যাহার নয়? বাস্তবতা হচ্ছে, জায়নবাদীদের চাপের মুখে নতিশিকার করেছে শার্লি এবদো। অ্যান্টিসেমেটিক তকমার ভয়ের কাছে মুক্তচিন্তা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সব তুচ্ছ। অ্যান্টিসেমেটিক তকমা এমন অস্ত্র, যা ব্যবহার করে ইসরায়েল নিজেদের সব অপকর্ম জায়েজ করে নিচ্ছে।

ইসরায়েল ফিলিস্তিনে আরেকটি হলোকাস্ট পরিচালনা করছে দ্বিতীয় যুদ্ধের হলোকাস্টের সুযোগ নিয়ে। জায়নবাদী ইসরায়েলের সব কর্মকাণ্ড মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। এ নিয়ে মন্তব্য করলেই জায়নবাদী নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সবাই হইহই করে মাঠে নেমে পড়বে। গেল গেল রব উঠে যাবে। সবাই মিলে অ্যান্টিসেমেটিক বলে সাব্যস্ত করবে। ইহুদিরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্যাতিত হয়েছে। তাই বলে কি ইসরায়েলের নির্যাতনের প্রতিবাদ করা যাবে না? আজ থেকে ৫০ বা ৭০ বছর পর যদি ফিলিস্তিনিরা কোনো জাতির ওপর নির্যাতন করে, তখন কি তার কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না এই কারণে যে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল। করলেই কি ইসলামবিদ্বেষীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হবে?

কুকর্ম ঢেকে রাখার জন্য অন্য কাউকে তকমা লাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের অনেক পুরোনো চর্চা। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শাসকেরা এই অস্ত্রের প্রয়োগ করে থাকে। জার্মানির হিটলারও একই পদ্ধতির প্রয়োগ করেছিলেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে ইহুদিনিধনের প্রতিবাদ করলেই বিভিন্ন তকমা লাগিয়ে দেওয়া হতো। মুসোলিনি, মার্শাল টিটো বা হালের সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, হোসনি মোবারকেরাও এর বাইরে ছিলেন না। গুম-খুন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল এসব দেশে। এখনো হচ্ছে। অনেক দেশেই বিভিন্ন তকমা সেঁটে দেওয়ার কৌশলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দুঃশাসনকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেয়নি ইসরায়েল। এখন তারা নিজেরাই আরেকটি মানবিক বিপর্যয়ের কারণ। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, কেউই শিক্ষা নেয়নি ইতিহাস থেকে। তাই দেশে দেশে সম্পদ, ধর্মের নামে যুদ্ধ হয়। গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়। যুগে যুগে লৌহমানব-মানবীরা ফিরে আসে। প্রতিবাদী জনতা বিভিন্ন তকমা গায়ে নিয়ে গুম, খুন, নির্যাতনের শিকার হয়। নদীর তীর, খাল, বিল, মাঠ, প্রান্তরে তাদের বেওয়ারিশ অবস্থায় পাওয়া যায়। কেউ কেউ চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যায়। তবে দিন শেষে লৌহমানব-মানবীদের পতনও হয় নির্মমভাবেই। কিন্তু কেউই ইতিহাসের দিকে ফিরেও তাকায় না। শিক্ষাও নেয় না।

ড. মারুফ মল্লিক: রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি

সূত্রঃ প্রথম আলো 

Comment