No icon

ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কি শুধুই কাগুজে?

সামরিক শক্তিকে বিশ্বের শক্তির আধার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বে নিজ নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি জানান দিতে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো। সামরিক শক্তি বাড়িয়ে অন্যকে পেছনে ফেলতে যেন মরিয়া এরা। অন্তত পরিসংখ্যান তা-ই বলে। বছর বছর বাড়ছে অস্ত্রশস্ত্র কেনাকাটা। ভারত প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে ঠিকই; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মান ও আকারের দিক দিয়ে তা বাড়ছে কি না।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত একটি মাইলফলক পেরিয়েছে। দেশটি বার্ষিক বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করেছে ৬২ বিলিয়ন ডলার, যা তার সাবেক ঔপনিবেশিক মনিব যুক্তরাজ্যের ব্যয়ের চেয়ে বেশি। ভারতের সামনে আছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব ও রাশিয়া। এ কয়েকটি দেশ ভারতের চেয়ে আরও মুক্ত হাতে তাদের সৈন্যদের জন্য ব্যয় করে থাকে। প্রায় এক দশক ধরে অস্ত্র কেনার দিক দিয়ে ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ একটি দেশ। জনশক্তি এবং যুদ্ধজাহাজ ও জঙ্গি বিমানসংখ্যার কারণে ইতিমধ্যে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচের মধ্যে ঢুকেছে ভারত।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) ‘দ্য মিলিটারি ব্যালেন্স ২০১৮’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দিন দিন ভারতের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটি সামরিক ব্যয়ে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর এতে করে প্রথমবারের মতো শীর্ষ পাঁচ থেকে ছিটকে পড়েছে যুক্তরাজ্য। গত বছরে সামরিক খাতে ভারতের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। ২০১৬ সালে এ খাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ১১০ কোটি ডলার।

ভারতের আকাঙ্ক্ষা 
উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিক থেকে যদি পরিমাপ করা যায়, তবে অন্য অনেকের চেয়ে ওপরের দিকে ভারত। কারণ, ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বজায় রাখতে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে দেশটিকে। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক ক্লাবে ঢোকার পর ভারত নিজের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এ ছাড়া আন্তমহাদেশীয় সাবমেরিনগুলো নিখুঁত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ২০১৪ সালে বিজেপির নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরই নিজের অবস্থান জানান দিতে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াতে থাকেন। গত বছর দোকলাম নিয়ে চীনের সঙ্গে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাও বাড়ে।

ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইপিআরআই) প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৭—এই চার বছরে ভারতের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ২৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া থেকে ভারত অস্ত্র কেনে। এই চার বছরের মধ্যে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে সামনে চলে এসেছে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালে পুরো বিশ্বে যত অস্ত্রের বেচাকেনা হয়েছে, তার ১২ শতাংশই কিনেছে ভারত। আর পাকিস্তান কিনেছে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে সামনে চলে এসেছে। রয়টার্স ফাইল ছবিভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে সামনে চলে এসেছে। রয়টার্স ফাইল ছবিঅস্ত্রের জন্য ভারতের আকাঙ্ক্ষা দিন দিন বাড়ছে। দেশটি অস্ত্র কেনার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। কারণটা আসলে অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষমতা তাদের নেই।

গত মাসের শুরুর দিকে গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার নামের একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছিল, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর তালিকায় ভারত আছে চারে। এমনকি চীনের তুলনায় ভারতের সেনাবাহিনীর আকার বড়।

২০০৮-১২ সালের তুলনায় ২০১৩-১৭ সালে ভারতের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। চীনের অস্ত্র আমদানি একই সময় কমেছে ১৯ শতাংশ। কারণ, অস্ত্র উৎপাদনে আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছে চীন।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদি সরকার ৫ হাজার ৫৭ লাখ ডলারের সামরিক অস্ত্র কেনে। এ বছর ফ্রান্সের রাফায়েল যুদ্ধবিমান কিনতে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরোয় একটি চুক্তি করেছে ভারত। ভারতীয় মুদ্রায় যা ৫৮ হাজার কোটি রুপির মতো। মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত তাদের প্রবৃদ্ধির ১ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করছে সামরিক খাতে।

চীন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে ২৫ শতাংশ, যেখানে ভারত বাড়িয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো রাহুল রায় চৌধুরী বলেন, দোকলাম ঘটনার পরে চীন ও ভারতের মধ্য সামরিক ভারসাম্যর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে চীন। ২০০০ সালের পর থেকে দেশটি অধিক সাবমেরিন, রণতরি, রণতরিবিধ্বংসী জাহাজ, মাঝারি আকারের যুদ্ধজাহাজ তাদের প্রতিরক্ষা খাতে যুক্ত করেছে। চীনের সামরিক খাতে এ সংযোজন যৌথভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি চীন এ অঞ্চলে মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সামরিক ভারসাম্য পর্যালোচনার পর দেখা যাবে, গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো যুক্তরাজ্যর চেয়ে ভারত তার আঞ্চলিক সম্পদ বিকাশে অধিকতর সামর্থ্য রাখে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র না পাওয়ার সীমাবদ্ধতা আছে। এ ছাড়া গোলাবারুদ এবং খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতিও বিদ্যমান।

অস্ত্র কেনায় সমালোচনা
অনেক চুপ থাকলেও এ বছরের মার্চে সমালোচনা শুরু হয় অস্ত্র কেনা নিয়ে। ভারতের সরকারি কর্মকর্তা, বেসামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মুখ খোলেন। প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটি দেশটির সামরিক অস্ত্রের স্বল্পতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে। পরে জনগণও এই বিতর্কে যোগ দেন। বিতর্কে গরিবদের সম্পদ বরাদ্দের প্রশ্নে শুধু নয়, সশস্ত্র বাহিনীর সংস্কার, পুনর্বিন্যাস বা সংশোধনের মতো বিষয়গুলোও সামনে চলে আসে।

অস্ত্রসংক্রান্ত সেনাবাহিনীর প্রতিবেদনে ভারতের পার্লামেন্ট সদস্যদের অবগত করে বলা হয়, সেনাবাহিনীর ৬৮ শতাংশ অস্ত্র, যার প্রথম সরবরাহ আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে, এগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের ট্যাংক বিএমপি-টু এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট বন্দুক শিলকাও আছে। এসব অস্ত্রকে ‘দুষ্প্রাপ্য’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ অত্যাধুনিক। সেনাবাহিনীর ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘দুটি দেশের যুদ্ধ বাধলে বিদ্যমান অস্ত্র ও গোলাবারুদের অবস্থা তা এক কথায় বর্ণনা করতে গেলে বলতে হবে, ভালো নয়।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর তালিকায় ভারত চারে। রয়টার্স ফাইল ছবিবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর তালিকায় ভারত চারে। রয়টার্স ফাইল ছবিকমিটি বলেছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিষয়টি তুলে ধরা হলেও সেনাবাহিনী সৈন্যদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্য সেবার অবস্থায়ও ভালো নয়। মিগ-২১ (মিগ টুয়েন্টি ওয়ান) এখনো সেকেলে। এ ছাড়া নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণের কর্মসূচিতেও পিছিয়ে আছে।

হঠাৎ কেন ব্যয় বৃদ্ধি
গত এক দশক ভারত জিডিপির অনুপাতে প্রতিরক্ষা বাজেট আসলেই কমিয়েছে। চীনের তুলনায় তা অনেক কম। আরও বিস্তারিতভাবে বললে, নাটকীয়ভাবে ব্যয় কমানো হয়েছে। নৌবাহিনীর জন্য ২০১৪ সালের সামরিক ব্যয় ছিল ১৩ শতাংশ। গত বছর ২০১৭ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে আটে। এক দশক আগে বিমানবাহিনীর বরাদ্দ ছিল ১৮ শতাংশ। সেখান থেকে গেল বছরে কমে তা দাঁড়ায় ১২ শতাংশে। এরপর সেখান থেকে পুরো ইউ টার্ন নিয়ে ব্যয় বাড়ানো শুরু হয় এ বছরে। সেনাবাহিনীর সদস্য-কর্মচারীদের বেতন বাড়ে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত।

ভারতে সেনাদের কীভাবে ব্যবহার করা হয়, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সীমান্তে পাকিস্তানের চাপ বৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারত কিছুটা নির্বিকারই ছিল। কারণ, একটি পরিসংখ্যানে বিষয়টি প্রমাণিত হবে। সীমান্তে গোলাগুলিতে ২০১৫ সালে যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৫২ জন, সেখানে গত বছরে এর সংখ্যা ৫ গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬০ জনে। ভারত ও পাকিস্তান দুই পক্ষেই হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকলেও সমাধানের কোনো উদ্যোগ সেভাবে দেখা যায়নি। সীমান্তে চীনের সঙ্গেও সমস্যা দিনকে দিন বেড়েছে। গত বছরে দোকলাম নিয়ে ভারত-চীনের মধ্য বেশ উত্তেজনা ছিল। দোকলাম ঘটনা চীনের অবস্থানকে ব্যাপকভাবে সুদৃঢ় করেছে।

দোকলাম নিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানির মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, দোকালামের ঘটনা দেখিয়েছে যে ভারত কৌশলগত জয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে, কিন্তু চীনের রণকৌশলগত পর্যায়ে জয়লাভের জন্য ধৈর্য ও চাতুর্য রয়েছে। চীনের কারণে এ অঞ্চলেও ভারতের প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। নেপাল ও মালদ্বীপের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি পরিষ্কার।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে উপহাস করতেন। কথাটাকে ঘুরিয়ে আজ হয়তো তাঁর দেশের দক্ষিণী প্রতিবেশীকে ‘কাগুজে হাতি’ বলা যায়।

দ্য ইকনমিস্ট অবলম্বনে

Comment