No icon

রাসায়নিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কি হবে?

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য শনিবার সকালে সিরিয়ায় যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে, পশ্চিমারা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এটা রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। সিরিয়ায় হামলা নিয়ে আরও অনেকে অনেক কিছু বলছে।

পশ্চিমারা আরও হামলা হয়তো চালাবে। পাল্টা হামলার ঘটনাও হয়তো ঘটবে। পশ্চিমা মিত্ররা এ ব্যাপারে যা বলছে, তা হয়তো অতি সরলীকরণ বলে প্রমাণিত হবে। কেননা, সিরিয়া ইতিমধ্যেই পশ্চিমাদের ভাষ্যের প্রতিবাদ করছে। পশ্চিমারা বলছে, সিরিয়ার দুমায় নিরীহ জনগণের ওপর আসাদ বাহিনীর রাসায়নিক হামলার জবাবে তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর এই হামলার সুযোগে সিরিয়া এবং এই অঞ্চলে অন্য সামরিক খেলোয়াড়েরা-ইসরায়েল, তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব এবং তাদের ছায়া শক্তিগুলো ও জিহাদি গোষ্ঠীগুলো হয়তো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করবে। হামলার এই প্রাথমিক পর্যায়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমে যেভাবে খবর এসেছে তাতে মনে হচ্ছে, এই হামলা হবে অপেক্ষাকৃত সীমিত।

কিন্তু সিরিয়া সংকটের জটিলতা এবং এ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য যে ব্যাপক আঞ্চলিক লড়াই, তা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলতে পারে।

এসবের বাইরে গিয়ে বলতে হয়, সিরিয়ার ওপর এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যতটা না সামরিক হস্তক্ষেপ, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ। ক্লজউইটজের একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, যুদ্ধের অপর একটি অর্থ হচ্ছে রাজনীতির ধারাবাহিকতা। সে অর্থে তিনটি জিনিসের জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে।

প্রথমত, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর আন্তর্জাতিক যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা বহাল রাখা। দ্বিতীয়ত, সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কের আধিপত্যের যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করা এবং তৃতীয়ত, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে মানবিক ও আঞ্চলিক সংকটে পশ্চিমাদের যুক্ত হওয়ার চেষ্টা।

সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে এসব লক্ষ্য কত দূর অর্জিত হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে আপাতদৃষ্টিতে এই হামলা রাসায়নিক অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমিত এবং পেন্টাগনের মতে, এই হামলার প্রভাব সিরিয়ার ওপর তেমনভাবে পড়বে না। হামলা নিয়ে দামেস্ক, তেহরান ও মস্কোর তেমন একটা উচ্চবাচ্য না করা বা ক্ষুব্ধ না হওয়াটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তারা বেশি দিন চুপ করে থাকবে না বলেই মনে হয়।

সিরিয়ার ওপর এই হামলা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ততার দ্বিমুখী দিকটিকে তুলে ধরেছে। সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে জড়িত। এখন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও নিজেকে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি সিরিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে চান। গত বছরের মতো ট্রাম্প এখন পেন্টাগনের পরামর্শ মেনে চলছেন এবং বাশার আল-আসাদের বাহিনীর ওপর শুধু সার্জিক্যাল অভিযানে সীমিত রেখেছেন। আসাদ বাহিনীর ওপর এই হামলা হতো ট্রাম্পের রাশিয়া নীতির কফিনে আরেকটি পেরেক।

এই হামলাকে ইউরোপে ও বিশ্বে ফ্রান্সের অবস্থান সংহত করতে দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দৃঢ়সংকল্প বা ইচ্ছাপূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলেই মনে হচ্ছে। মাখোঁর পররাষ্ট্রনীতিতে ফরাসি নেতৃত্ব ও ইউরোপীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন রয়েছে। এই হামলার মধ্য দিয়ে মাখোঁ তাঁর নীতি ও কৌশলকে এগিয়ে নিতে পারবেন।

আর ব্রিটেন? দেশটির প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এখন বৈদেশিক নীতি এবং দেশীয় রাজনীতির বাস্তবতায় আটকা পড়েছেন। ব্রিটেন চায় সিরিয়া ও সসব্রিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। দেশটি চায় না যে এ ব্যাপারে শুধু ফ্রান্স কোনো পদক্ষেপ নিক বা যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র মিত্র হোক।

এ ব্যাপারে ব্রিটেনের জনমতও বেশ স্পষ্ট ও বাস্তববাদসম্মত। তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে তারা এ ব্যাপারে সচেতন যে রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মতো বৈশ্বিক মানবিক মূল্যবোধগুলোর পক্ষে থাকলে তা রক্ষার জন্য মাঝে মাঝে লড়াইও করতে হয়।

এই হামলা সম্পর্কে দেওয়া এক ভিডিও ভাষণে থেরেসা মে বলেন, এটা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে কোনো হস্তক্ষেপ নয়, কোনো শাসন পরিবর্তনের জন্য এই হামলা নয়। তিনি বলেন, তিনি হিসাব করে দেখেছেন, মাত্র চারটি যুদ্ধবিমান এই হামলায় অংশ নিয়েছে-এটা রাজনৈতিকভাবে তাঁর জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। কারণ, এর চেয়ে বেশি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে হলে তাঁকে পার্লামেন্টের কাছে অগ্রিম অনুমতি নিতে হতো।

পশ্চিমারা যে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, তা তারা বোঝাতে পেরেছে। তবে আবারও বলতে চাই, এই হামলাই যথেষ্ট নয়।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত

মার্টিন কেটেল: যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক

Comment